Saturday, 29 May 2021

জরায়ুর স্থানচ্যুতি কারণ :-

  জরায়ুর স্থানচ্যুতি কারণ :-



    নানা কারণে জরায়ুর স্থানচ্যুতি হতে পারে, যেমন কষ্টকর প্রস্তাব, প্রস্রাবের পর ভারী কোনো জিনিস তোলা নামা করা বা বেশি পরিশ্রম করা অথবা পড়ে গিয়ে তলপেটে আঘাত কিংবা বার বার গর্ভপাত হওয়া, প্রস্রাবের ঠিক পরেই গর্ভবতী হওয়া,  হঠাৎ উঠে বসা বা দাঁড়ানো, যৌন মিলনের সময় জরায়ূতে আঘাত পাওয়া, বিশেষত কাঁচা পোয়াতি অবস্থায় অর্থাৎ প্রসবের পর যাদের জরায়ুর তখনও স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হয়নি এমন অবস্থায় মিলিত হলে জরায়ুর স্থানচ‍্যুতি ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায় ।  এছাড়া বাহ্য প্রস্রাবের সময় বার বার বেশি চাপ বা কোঁথ দেওয়া বা জরায়ুর সংক্রান্ত নানা রকম রোগ যেমন এণ্ডোমেট্রাইটিস, জরায়ুর টিউমার ইত্যাদি কারণে জরায়ুর অবস্থান পরিবর্তন হয় । এছাড়াও গর্ভাবস্থায় জরায়ুর বৃদ্ধির সাথে সাথে তার সঙ্গে সংলগ্ণ বন্ধনী ও পেশী গুলিতে টান পড়ে সেগুলি অনেক বেড়ে যায় এবং প্রস্রাবের পর জরায়ু স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হবার সময় অর্থাৎ জরায়ুর গুটিয়ে স্বাভাবিক হবার সময় সংলগ্ণ বন্ধনী ও পেশীগুলি যদি ঠিকমতো সংকুচিত না হয়ে আগের মত অবস্থায় ফিরে না আসে ও ঢিলা থেকে যায় তাহলেও জরায়ুর ডিসপ্লেমেন্ট ঘটতে পারে । বিশেষত এই অবস্থায় যদি খাটাখাটনি বেশী করা বা আঘাত জনিত কোন ঘটনা ঘটে । অনেক সময় বহু সন্তানবতীদের জরায়ু ও তার লিগামেন্ট বা বন্ধনী গুলি স্থায়ীভাবে শিথিল হয়ে পড়ে ফলে এ ক্ষেত্রে স্থানচ্যুতি এড়ানো যায় না ।

    রেট্রোভার্সান, রেট্রোফ্লেক্সান এবং প্রোল‍্যান্স প্রকারের স্থানচ‍্যুতি সাধারণত সন্তানবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষকরে বহু সন্তানবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে । তবে জন্মগতভাবেও কারো কারো রোট্রোভার্টড জরায়ু দেখা যেতে পারে । এছাড়াও কষ্টকর প্রসবের পর দীর্ঘদিন ধরে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে জরায়ু রেট্রোভার্সানের সম্ভাবনা থাকে । নিঃসন্তান বা কুমারী মেয়েদের রেট্রোফ্লেক্সান খুব কম হয় । প্রল‍্যান্স স্থানচ্যুতি অনেক সময় জরায়ুর রেট্রোভার্সান থেকেও হতে পারে । রেট্রভার্টেড ইউরিটাসে গর্ভসঞ্চার হলে অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই গর্ভপাত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে । এই অবস্থায় জরায়ু খুব বেশি শক্ত হয়ে ওঠে  এবং তখন তা নীচে রেক্টাম ও উপরের ব্লাডার কে চেপে ধরে,বা অবরোধের লক্ষণ প্রকাশ করে । এছাড়া রেট্রোভার্টেড় ইউটিরাস কেসে অন্যান্য আরো যেসব দুর্বল দেখা দেয় তা হল, ঋতুস্রাবের গোলমাল ঘটে । প্রতি মাসিকের সময় জরায়ুতে প্রচুর পরিমানে রক্ত আসে এবং সেই সময় রেক্টামে অবরোধ ঘটতে দেখা যায় । জরায়ু থেকে অত্যাধিক রক্তস্রাব হতে পারে । লিউকোরিয়া হতে পারে এছাড়াও কোমরে ও পিঠে বেদনা এবং অনেকের মাসিক বিকার দেখা দেয় । অনেক সময় এর থেকে জরায়ুর Prolapse  হতে পার ।


প্রসবের পর জরায়ু স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত :-     

       প্রসাবের পর জরায়ু আস্থে আস্থে সংকুচিত হয়ে আসতে থাকে এবং ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে তার পূর্ব অবস্থায় তথা স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হয়ে পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে আসে । এই সময়কে Puerperium বলে । এই সময় সহবাস বা যৌন মিলন করা উচিত নয় ।এই সময় সহবাস করলে কাঁচা বা দুর্বল জরায়ুতে আঘাত লাগে তার স্থানচ্যুতি ঘটতে পারে ।  কুমারী  বা নিঃসন্তান মহিলাদের জরায়ু থেকে সন্তানবতী মহিলাদের জরায়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং তার গহ্বরও আগের থেকে বড় হয়ে যায় । মহিলাদের শৈশবের জরাই ছোট এবং নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে তবে বয়সন্ধি বা যৌবন আগমনের সাথে সাথে এটি বড় হয়ে স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হয় এবং যৌন হরমোন এর প্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে । মনোপজের পর এবং বার্ধক্যে মহিলাদের জরায়ু শুকিয়ে ছোট হয়ে আসে । জরায়ুর মাঝে খাঁজ পড়ে  এবং এর মধ্যে রক্ত চলাচলও  কমে আসে যার ফলে সেটি ফ্যাকাশে দেখায় । অনেক সময় জরায়ুর গ্রীবার মুখবুজে যায় ।


জরায়ুতে নার্ভ ও রক্ত সরবরাহ:-

    ইউটারিন ধমনী নামক ইন্টার্নাল ইলিয়াক ধমনীর একটি প্রশাখা থেকে জরায়ুর মধ্যে রক্ত সরবরাহ হয় এবং এটি  উপশিরার মাধ্যমে জরায়ু থেকে রক্ত ইন্টার্নাল ইলিয়াক ভেইনে ফিরে যায় ।  জরায়ুতে অনেক নার্ভের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে থাকে এবং তা আসে বস্তির Splanchnic  ও Vaginal প্লেক্সাস থেকে ।


জরায়ুর কাজ:-

     জরায়ুর প্রধান কাজ হচ্ছে নিষিক্ত বা ফার্টিলাইজড ওভাম বা ভ্রুণের প্রথম অংকুর কে গ্রহণ করা ও ভ্রুণের রক্ষণাবেক্ষণ ও তার লালন পালনের ব্যবস্থা করা অর্থাৎ গর্ভ গ্রহণ করা ও নয়  মাস দশ দিন সেই ভ্রুণকে সযত্নে ধারণ করে রাখা । তাছাড়া সন্তান প্রসবে সাহায্য করা, মাসিক ঋতু কাজে অংশগ্রহণ করা প্রভৃতি হচ্ছে জরায়ুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ।








Saturday, 22 May 2021

২/ জরায়ু বা গর্ভাশয় ( Uterus বা Womb )

 ২/ জরায়ু বা গর্ভাশয় ( Uterus বা Womb )

     মহিদের পেলভিস বা বস্তিকোটর  অর্থাৎ তলপেটে অবস্থান করে জরায়ু বা গর্ভাশয় নামক মাংসপেশী  সমৃদ্ধ  স্ত্রী অন্তজননেন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রটি । জরায়ুর ভেতর টা ফাঁপা ( hollow ) এবং দেখতে অনেকটা ন্যাসপাতি পেঁপে বা ন‍্যাসপাতির মত । অবিবাহিত মহিলাদের জরায়ু শশার মত দেখতে হয় । গর্ভাবস্থায় জরায়ুটি ভ্রুণকে নয় মাস দশ দিন ধারণ করে রাখে । এই জরায়ুর মধ্যেই ভ্রুণ প্রতিপালিত হয় এবং বাড়তে থাকে । জরায়ুর চারপাশের দেয়াল বেশ মোটা পেশি দিয়ে গঠিত হয় । জরায়ুর  বাইরের আবরণটি অর্থাৎ প্রথম স্তরটি পেরিটোনিয়াম পর্দা ( serous membrane )  দিয়ে গঠিত । এরপরে স্তরটি অর্থাৎ মাঝখানের স্তরটি বেশ মোটা মাংসপেশি দিয়ে গঠিত । জরায়ুর এই মাংসপেশির  আবরণ কে বলে myometrium . এবং শেষের স্তর বা একেবারে ভিতরের আবরণটি মিউকাস মেমব্রেন দিয়ে গঠিত হয় । ভেতরের এই মিউকাস মেমব্রেনের  আবরণকে বলে জরায়ুর অন্তবেস্টক বা এণ্ডোমেট্রিয়াম ( endometrium ) ।


      জরায়ুর উপরিভাগের দুই পাশে থাকে দুটি ডিম্বকোষ বা ওভারি এবং এর উপরিভাগের দুই প্রান্তে থেকে যে দুটি নালী বারিয়েছে তাদেরকে বলে ডিম্ববাহী নালী বা কালল নল ( Fallopian tubes )।

    নিঃসন্তান মহিলাদের বা যাদের একবারও গর্ভ হয়নি তাদের জরায়ুর (সার্ভিক্স সহ ) লম্বায় তিন ইঞ্চির মত  বা সামান্য বেশি হতে পারে এবং চওড়ায় প্রায় দুই ইঞ্চি হয়ে থাকে । আর ওজন হয় সাধারণত 40 থেকে 50 গ্রামের মধ্যে । তবে দুই একবার সন্তান হয়ে যাবার পর জরায়ু প্রায় দ্বিগুণ ভারী হয়ে যায় ও তার গহ্বর আগের চেয়ে আকারে বড় হয়ে যায় । 

       জরায়ুর  উপরিভাগে গোলাকার বলের মতো অংশটি কে বলে তলদেশ বা ফান্ডাস ( Fundus বা Base ) । এটি হচ্ছে জরায়ুর সর্বোচ্চ অংশ । এরপর থাকে জরায়ুর যে অংশ আরম্ভ হয়েছে তাকে বলে বডি বা দেহ । এটিকে আবার Corpus  বলা হয় । এটি  জরায়ুর মধ্যভাগ অবস্থিত এবং লম্বা প্রায় দুই ইঞ্চি হয়ে থাকে । বডির নিচের অংশ সরু হয়ে নেমে এসে যে অংশের সৃষ্টি করে করেছে তাকে  জরায়ু গ্রীবা  বা Cervix বলে । 

    বর্তমানে অনেকে অবশ্য জরায়ুকে দুই ভাগে ভাগ করে বর্ণনা করে থাকেন । যেমন মেইন বডি বা প্রধান দেহ এবং সার্ভিক্স বা জরায়ু গ্রীবা । সার্ভিক্স লম্বায় প্রায় এক ইঞ্চির মত হয় । সার্ভিক্স হচ্ছে জরায়ু নিচের অংশ এবং যোনিপথে এসে যুক্ত হয়েছে । বডি এবং সার্বিক এই দুই অংশের সংযোগস্থল একটু সরু হয় । এই অংশকে বলে Isthmus বা যোজক ।জরায়ু গহ্বরে প্রবেশের পথ হচ্ছে, এই সার্ভিক্স এর মধ্যে একটি ছোট ছিদ্র পথ , যাকে বলে জরায়ুর মুখ ।  সারভিক্সের শেষ অংশটুকু থাকে যোনিপথের মধ্যে ,অর্থাৎ বলা যায় যোনি পথের শেষ ভাগ জরায়ুগ্রীবার কিছুটা অংশ বেষ্টন করে থাকে । নিঃ সন্তান অথবা এক সন্তান নারীদের থেকে বহু সন্তানবতী নারীদের জরায়ু গ্ৰীবা এবং জরায়ুর মুখ অনেকটা বড় হায় । সন্তানহীন মহিলাদের সারভিক্সের মুখ সাধারণত ছোট ও গোলাকৃতি হয় । সারভিক্সের এই ছিদ্রপথ এর ভিতরের দিক অর্থাৎ উপরের দিকের মুখ কে  Internal Os বলে । এবং বাইরের দিকের  External Os বা নিচের মুখে বলে । এই External Os যোনির মধ্যে অবস্থিত অর্থাৎ সারভিক্সের বাইরের মুখ যোনি পথে এসে খুলেছে । যোনির মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে পরীক্ষা করলে সারভিক্সের বাইরের মুখ আঙুলের ডগায় অনুভব করা যায় । এছাড়া সার্ভিস এর অংশবিশেষ যাহা যোনিপথের উপরের দিকের প্রান্তে ঝুলে থাকে সেটাও বাইরে থেকে দেখা যায় । ভ্যাজাইনার মত সারভিক্সের অংশও মিউকাস মেমব্রেন দিয়ে ঢাকা থাকে । তবে সারভিক্সের মিউকোসা মসৃণ হয় যেটা যোনির মধ্যে দেখা যায় না । যোনিপথের মিউকোসল লাইনিং, করোগেটেড টিনের মতন ঢেউ খেলানো  হয়েথাকে ।

     জরায়ুর দেওয়াল  মোটা বেশি দিয়ে গঠিত হলেও এই পেশী খুবই সম্প্রসারণশীল । জরায়ু পেশির এই সম্প্রসারণশীল গুণ এর জন্যই গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের বৃদ্ধির সাথে সাথে জরায়ুর আকার  ক্রমশ বাড়তে থাকে ও বস্তি গহবর ছড়িয়ে আরো কয়েক ইঞ্চি উপরে উঠে বক্ষস্থল এর নিম্নদেশ পর্যন্ত চলে আসে অর্থাৎ জরায়ুর ফাণ্ডাস বুকের স্টার্নাম হাড়ের জাইফয়েড়  পসেসে গিয়ে স্পর্শ করে । প্রসাবের সময় জরায়ুর পেশি সংকুচিত হয়ে সন্তানকে সামনের সার্ভিস ও যোনিপথের মধ্যে দিয়ে বাইরে বের করে দিতে সাহায্য করে । গর্ভ অবসানের পর জরায়ু  আবার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ও আগের স্থানে ফিরে আসে । জরায়ু সংকুচিত হয়ে এইরূপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা কে বলে Uterine involution.

    

     জরায়ুর অবস্থান :-

     বস্তিকোটর বা পেলভিসে জরায়ুর অবস্থান উল্টানো ভাবে থাকে যা, উল্টে রাখা কলসির মত দেখায় । জরায়ুর ফাণ্ডাস বা তলদেশ ওপর দিকে এবং   গ্রীবা এবং মুখ নিচের দিকে থাকে ও যোনি মধ্যে আংশিক ঢুকে থাকে । জরায়ুর ভেতরের গহ্বর ক্ষুদ্র এবং লম্বা ও ফাঁপা ত্রিকোন আকৃতির হয়ে থেকে । জরায়ুর পেছনে দিকে থাকে রেক্টাম এবং সামনের দিকে অবস্থান করে ব্লাডার বা মূত্রথলি । মানে ব্লাডার এবং রেকটামে মাঝে অবস্থিত জরায়ু । তলপেটের মাঝামাঝি স্থানে স‍্যাক্রম হাড়ের ও সমান্তরালে এবং সামনের দিকে ব্লাটারের উপর একটু হেলে জরায়ু অবস্থান করে । স্বাভাবিক অবস্থায় সার্ভিক্স এবং জরায়ুর বডির সংযোগস্থল থেকে জরায়ুর বডি ঝুঁকে তলপেটের সামনের দিকে অবস্থান করে । যার ফলে জরায়ুর ফাণ্ডাস তলপেটের সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে এবং দেহটা কিছুটা মূত্রথলির উপরে ঝুঁকে পড়ে । আর সার্ভিক্সের এক্সটার্নাল অস থাকে পেছনে অবস্থিত রেকটাম ও স‍্যাক্রম অস্থির দিকে । দেখা যাচ্ছে যে জরায়ুর কিছুটা antiversion পজিশনে  (অর্থাৎ সামনের দিকে কিছুটা হেলে থাকে ) বস্তি কোটরে থাকে এবং এটাই স্বাভাবিক অবস্থায় । জরায়ু চারপাশ বিভিন্ন ধরনের ফাইব্রাস টিস্যুর বন্ধনী অর্থাৎ লিগামেন্ট দ্বারা আটকানো থাকে যেমন ব্রড লিগামেন্ট, রাউন্ড লিগামেন্ট, ইউটেরোস‍্যক্রাল লিগামেন্ট প্রভৃতি  ৬ রকম লিগামেন্ট দিয়ে জরায়ু বস্তিকোটরে আটকানো থাকে ।

    

    জরায়ুর স্থানচ্যুতি:-

      জরায়ু কতকগুলি পেশী, লিগামেন্ট  প্রভৃতির সাহায্যে পেলভিক এর চারপাশে আটকানো থাকলেও এটি একই স্থানে আবদ্ধ থাকে না । এর   নড়াচড়া দেখা যায়, কারণ এর বাঁধন গুলি খুব দৃঢ় নয় । কোনো কারণে এই বাঁধন গুলি শিথিল হয়ে গেলে বা জরায়ুর কতগুলি রোগের কারণে  বা অন্যান্য নানা কারণে জরায়ুটি অনেক সময় স্থানান্তর ঘটে বা সঠিকভাবে অবস্থান করতে পারে না, একেই  বলা হয় জরায়ুর বিচ‍্যুতি বা স্থানচ‍্যুতি । 

    জরায়ুর স্থানচ্যুতি নানা প্রকারের হয় যেমন এ্যণ্টিফ্লেক্সন ( Anteflexion ), রেট্রোফ্লেক্সান Retroflexion ), রেট্রোভার্সান (Retroversion ),  ও প্রল‍্যান্স (Prolapse of uterus)

      এ্যণ্টিফ্লেক্সন:- এ্যণ্টিফ্লেক্সার এর ক্ষেত্রে  ইউটিরাস সম্পূর্ণভাবে সামনের দিকে বেঁকে  গিয়ে ফাণ্ডাস অংশটি সার্ভিক্সের কাছে চলে আসে । এই অবস্থাটি ঠিক রেট্রোফ্লেক্সানের এর বিপরীত অবস্থা । এই ক্ষেত্রে সাধারণত সার্ভিসের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয় না । এটি স্বাভাবিক স্থানে থাকে । কেবলমাত্র জরায়ুর বিডিটি তলপেটের সামনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ে ।

    রেট্রোফ্লেক্সান:-  এই ক্ষেত্রেও সার্ভিক্সের অবস্থানের কোনো রকম পরিবর্তন হয় না,  তার মুখ  রেক্টাম ও স‍্যাক্রমের দিকে থাকে তবে এক্ষেত্রে জরায়ু পিছন দিকে বেঁকে যায় অর্থাৎ ফাণ্ডাস সহ দেহটি একেবারে পিছন দিকে বেঁকে গিয়ে ফান্ডাস অংশটি মলনালী ও স‍্যাক্রমে গিয়ে স্পর্শ করে ।

রেট্রোভার্সান :- এইক্ষেত্রে জরায়ু না মুড়ে বা নত না হয়ে  সম্পূর্ণ জরায়ুটি সোজা ভাবে পেছন দিকে হেলে পড়ে মানে ফাণ্ডাস সহ জরায়ু বডিটি সরাসরি মলনালীর গায়ে হেলে অবস্থান করে । এটাই  হচ্ছে এ্যণ্টিভার্সানের ঠিক বিপরীত অবস্থান ।

প্রোল‍্যান্স:- যোনির মধ‍্যে জরায়ুর নেমে আসা বা জরায়ু নীচের দিকে ঝুলে পড়াকে বলা হয় প্রোল‍্যান্স । যোনির মধ‍্যে ইউটিরাসের এই নেমে আসা বেশী বা কম হতে পারে । যেমন ইউরটিরাসের  অংশবিশেষ, অর্ধেকের বেশি অথবা সমগ্রহ জরায়ুটিই যোনিপথে ঝুলে থাকতে পারে । অনেক সময় সম্পূর্ণ জরায়ুটি যনি মূখের বাইরে বেরিয়েনি ঝুলে পড়তে পারে, একে তখন Providential of uterus বলে ।






Wednesday, 5 May 2021

১/ যোনি বা যোনীনালী( Vagina )

  যোনি বা যোনীনালী( Vagina )

    


    যোনিপথ বা যোনীনালী লেবিয়া মাইনরার ফাঁকা অংশ থেকে অর্থাৎ ভেস্টিবিউলে অবস্থিত যোনিমুখ থেকে আরম্ভ করে জরায়ুমুখ ও তার সঙ্গে যুক্ত জরায়ুগ্রীবার বাইরের অংশে পর্যন্ত বিস্তৃত ।  জরায়ুর সঙ্গে দেহের বাইরের অংশের যোগাযোগ রক্ষা করে এই যোনিপথ । অর্থাৎ অন্তজননেন্দ্রিয়ের সঙ্গে বহিজননেন্দ্রিয়ের যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে যোনিপথ ।  যদিও এটি কে এখানে বর্ণনা করা হয়েছে অন্ত জননেন্দ্রয়ের অংশ হিসেবে তবুও একে ঠিক সম্পূর্ণভাবে অন্ত জননেন্দ্রিয়ের অংশে বলা যায় না । কারণ আগেই বলেছি যে, এটি প্রধানত আপার আর লোয়ার জেনিটাল ট্রাক্ট  অর্থাৎ ভেতরের বাইরের জননেন্দ্রিয়ের সাথে সংযোগের মাধ‍্যম হিসাবে কাজ করে । এর কিছুটা অংশ দেহের ভিতরে এবং কিছুটা অংশ দেহের বাইরে অবস্থিত । যৌন মিলনের সময় এই পথেই পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করে এবং তা থেকে স্থলন হওয়া  বীর্যরসের ( Semen)  এই  শুক্রকীট গুলো ( Sperm cells )এই পথেই জরায়ুর মধ্যে প্রবেশ করে । 

    আবার প্রসবের সময় এই পথ দিয়ে শিশু ভূমিষ্ঠ হয় । এই জন‍্য যোনিপথকে আবার প্রসব পথা বলা হয় । যোনি নালির শেষ অংশ সার্ভিক্স বা  জরায়ুগ্রীবার এসে মিশেছে । এই শেষ অংশ সার্ভিক্সকে বেষ্টন করে রাখে । এই সার্ভিসকে সাধারনত আপার ও লোয়ার জেনিটাল ট্রেক্টের সীমানা বা বর্ডার  মানে করা হয় । যোনীনালির সম্মুখভাগ হল যোনি মুখ, যা ভেষ্টিবিউল অঞ্চলে অবস্থিত ।

      যোনিপথের বাইরের আবরণ মাংসপেশি দিয়ে গঠিত  ও  ভিতরের আবরণ অর্থাৎ ভেতরের অংশে থাকে নরম মিউকাস মেমব্রেন বা শ্লষ্মিক ঝিল্লী । যোনি পথ সম্পূর্ণ সোজা থাকে না । এটি কিছুটা বাঁকা অবস্থায় থাকে । প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলাদের যোনি পথের দৈর্ঘ্য 3 - 4 ইঞ্চির মত লম্বা হয় । যোনিপথের অগ্রভাগ সরু থাকে তবে সার্ভিক্স অর্থাৎ জরায়ুর গ্রীবার কাছে এই পথ কিছুটা চওড়া হয়ে যায় । যোনিপথের উপরে ও নিচে  দুটি দেওয়াল থাকে । উপরে দেওয়াল কে বলে উদ্ধ যোনি দেওয়াল বা সামনের দেওয়াল ( front  বা anterior wall ) এবং নিচে দেওয়াল কে বলে নিম্ন  যোনি দেওয়াল বা পশ্চাৎ যোনি দেওয়াল ( back  বা posterior wall ) । সামনের     দেওয়ালের থেকে পেছনের দেওয়াল  প্রায় এক ইঞ্চি বেশি লম্বা । সামনের দেওয়ালে ঠিক উপরে থাকে মূত্রনালী । পিউবিক হাড়ের  পিছনে ও জরায়ু বডির সামনের কিছুটা ত্রিকোণাকৃতি দেখতে ব্লাডার বা মূত্রথলি অবস্থিত । মূত্রথলি থেকে মূত্রনালী বেরিয়েছে । এবং মূত্রনালীর তলদেশে এণ্টরিয়ার বা উদ্ধ যোনির দেয়ালের গায়ে লেগে থাকে । পস্টরিয়ার দেওয়ালের নিচে বা পেছনে থাকে মলনালী বা মলাধার( rectum ) এবং গুহদ্বার ( anus) ।

    যোনি পথের ভেতরটি খুব কোমল এছাড়া ইলাস্টিক জাতীয় টিস্যু বা তন্তু দিয়ে গঠিত তাই এটি অতীব সম্প্রসারণশীল । মহিলাদের সন্তান উৎপাদনের সময় কালে অর্থাৎ পিউবার্টি  বা যৌবন আরম্ভের সময় থাকে মনোপজ বা ঋতু বন্ধের আগে পর্যন্ত সময় যোনিপথে লম্বা লম্বা অনেক উঁচু-নীচু  ভাঁজ দেখা যায় । তবে যৌবন আগমনের আগে ও মনোপজের পর অবশ্য (এই সময় কেউ এস্ট্রোজেন হরমোন ব্যবহার নাকরলে ) এই ভাঁজ থাকে না ।  তখন যোনীপথের উপরিভাগের ঝিল্লী সমান ও মসৃন হয়ে থাকে । যোনী নালীর উপরোক্ত দুটি দেওয়াল সাধারণত পরস্পর একসাথে লেগে থাকে অর্থাৎ উপর ও নিচের দেওয়াল অভ্যন্তরস্থ ভাগ গায়ে গায়ে সেঁটে থাকে । তবে যোনিপথে বহু খাঁজ থাকায় এবং এটি অতীব সম্প্রসারণশীল হওয়ার জন্য প্রয়োজনে যোনীনালী ফাঁক হয়ে অনেকটা প্রসারিত হয়ে লম্বা ও চওড়ায় বেড়ে যেতে পারে তাই এটিকে ইলাস্টিক চ্যানেলের সঙ্গে তুলনা করা যায় । এই জন্য যৌনমিলন বা সন্তান প্রসব সহজ হয় এবং ভ্যাজাইনা ফাঁক করে চিকিৎসকের পক্ষে এই অঙ্গ সহজে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় । বিশেষ করে প্রসবের সময় এই যোনীনালী ও যোনিমুখ প্রসারিত হয়ে এর ডায়ামিটার প্রায় 3 থেকে 4 ইঞ্চি মত হয়ে যায় । পরে আবার তা সংকুচিত হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে । এই যোনী পথে সক্ষ সুক্ষ বহু রক্তনালী ও স্নানু এসে মিশেছে । 

     মহিদের যৌবন আগমনের পর থেকে মনোপজ এর আগে পর্যন্ত সময়কালে যোনিনালী সর্বদা এক প্রকার রস দ্বারা সিক্ত বা ভিজে থাকে, আর এই রস হচ্ছে অ্যাসিড বা অম্ল ভাবাপন্ন । এই রস হচ্ছে অম্ল বা অ্যাসিড ভাবাপন্ন । যোনির মধ‍্যের এই রস হচ্ছে  ল‍্যাক্টক এ্যসিড । এই সময় যোনিপথে সর্বদা ল্যাকটিক এ্যসিড উপস্থিত থাকায়  জনন ইন্দ্রিয় ছোট-খাটো জীবাণু সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাই । যোনির মধ্যে স্বাভাবিক ভাবে কিছু এপিথেলিয়াল কোষ , আবর্জনা শ্বেত রক্ত কনা ও  কিছু নিরীহ জীবাণু যেমন ল‍্যাক্টব‍্যাসিলাস থাকে । এই ল্যাকটোব্যাসিলাস-এর সাথে যোনি গাত্রে ল্যাকটোজেন-এর  ক্রিয়ার ফলে সেখানে এই ল্যাকটিক অ্যাসিড যুক্ত রসের সৃষ্টি হয় । মেয়েদের যৌবন আগমনের পূর্বে এবং মনোপজ এরপর ভ্যাজাইনাতে এই জীবাণু ও খুব কম দেখা যায় ফলে এই সময় ভ্যাজাইনাতে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হতে পারে না এবং সেখানে অম্ল রসের অভাব ঘটে ফলে যোনি  শুষ্ক থাকে । মনোপজের পর এই অংশে এস্ট্রোজেনের ঘাটতিও এই অবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ী থাকে, তাই এই সময় জননেন্দ্রিয়ের ইনফেকশনের সম্ভাবনা বেশি থাকে । তবে ঋতুস্রাব চলাকালীন ও প্রসাবের পর কিছুদিন যোনির মধ্যে এই স্বাভাবিক অম্ল রসের অভাব থাকে তাই ওই সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাবধানে থাকা উচিত ও যৌনমিলনে এড়িয়ে চলা উচিত । তা না হলে জনন ইন্দ্রিয়ে সহজে ইনফেকশন ঘটতে পারে ।


স্ত্রী অন্তজননেন্দ্রিয়

        স্ত্রী অন্তজননেন্দ্রিয়


   মহিলাদের দেহের ভিতর যে জনন অঙ্গ গুলি অবস্থিত সেগুলো হলো - ১/  যোনি বা যোনি      নালী ( Vagina বা Vaginal canal ),  ২/ জরায়ু (Uterus ), ৩/ ডিম্বাশয়  ( Ovaries ) ও  ৪/ ডিম্ববাহী নালীদ্বয় ( Fallopian  বা  Uterine tube ) ।  স্ত্রী অন্ত জনন ইন্দ্রিয় কে আবার আপার  জেনিটাল ট্রাক্ট  বা জননেন্দ্রিয়ের উপরের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয় ।

    উক্ত জনন অঙ্গ গুলি সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ।